এয়ারলাইন্সে ভাড়ার ব্যাপারটা সাধারন যাত্রীদের কাছে সব সময়েই একটা বিতর্কের বিষয় হয়ে দাড়ায়। এটা নিয়ে অনেকের অভিযোগের শেষ থাকেনা। অবশ্য টিকিট ক্রেতাদের অভিযোগের যথেষ্ট ভিত্তি আছে। কারন আন্তর্জাতিক বা ডোমেস্টিক, সব ধরনের বিমানের ভাড়া ক্রমাগত পরিবর্তিত হতে থাকে। এই সপ্তাহে আপনি যে ভাড়ায় কক্সবাজার বা কুয়ালালামপুর গেলেন, এর ২ সপ্তাহ পরে এই দামে বিমান টিকিট নাও পেতে পারেন। কম বেশী হতেই পারে। একটু ঝামেলার মনে হলেও এই ভাড়ার ব্যাপার গুলো এভাবেই নিয়ন্ত্রন করে থাকে বিমান সংস্থাগুলো।

এর কারন হল এয়ার লাইন্স ইন্ডাস্ট্রিতে বহুল প্রচলিত ডায়নামিক প্রাইসিং মেথড। এই মেথড অনুযায়ি একটা বিমানের সব আসনের ভাড়া কখনই সমান হবে না। এমন কি সব ইকোনমি ক্লাসের সিট বা বিজনেস ক্লাসের সিটের ভাড়াও এক হবে না।

ডায়নামিক প্রাইসিং কি?

এর কারন বুঝতে হলে আমাদের সবার আগে জানতে হবে ডায়নামিক প্রাইসিং কি? এটি এমন একটি প্রাইসিং মেথড যা পরিবর্তনশীল। এবং এই ভাড়া পরিবর্তনের ব্যাপারটা সম্পূর্ণরূপে এয়ারলাইন্স সংস্থার আওতাধীন। প্রতিটি ফ্লাইটের যাত্রী সংখ্যা, খালি আসন সংখ্যা, ফ্লাইটের চাহিদা, ডিপারচার টাইম, গন্তব্য, বছরের বিশেষ সিজন, টিকেট ক্যান্সেলেশন সংখ্যা ইত্যাদি কিছু ফ্যাক্টরের ডাটা অ্যানালাইসিস এর মাধ্যমে এয়ারলাইন্স সংস্থা এই সিদ্ধান্ত গুলো নিয়ে থাকে। ডাইনামিক প্রাইসিং কে সারজ প্রাইসিং, ডিমান্ড প্রাইসিং ও টাইম বেসড প্রাইসিংও বলা হয়ে থাকে। ডায়নামিক প্রাইসিং এর অতি পরিচিত একটি উদাহরন হল রাইড শেয়ারিং কোম্পানী গুলো যেমন উবার, পাঠাও ইত্যাদি। খেয়াল করে দেখবেন পিক আওয়ার এ ভাড়া বেশ বেশী থাকে, আবার অফ পিকে ভাড়া কমে আসে।

 

 

 

ড্রিমলাইনার ৭৮৭
বাংলাদেশ বিমানেও ডায়নামিক প্রাইসিং মেথড ব্যবহার করা হয় (ছবি কৃতজ্ঞতাঃ জনাব শাকিল মিরাজ)

ডায়নামিক প্রাইসিং কি এবং কিভাবে কাজ করে

এই প্রাইসিং মেথোড শুরু হয় ১৯৮০ সালের দিকে, আমেরিকাতে। এর মূল কারন ছিল তেলের দাম বেড়ে যাওয়াতে এয়ারলাইন্স ইন্ডাস্ট্রিতে প্রফিট বাড়ানোর একটা প্রয়োজনীয়তা। একটা এয়ারলাইন্সের একমাত্র লক্ষ্য থাকে যেকোন একটা ফ্লাইটের সর্বচ্চ সংখ্যক সীট সর্বচ্চ মুল্যে বিক্রি করা। ফ্লাইটকে লাভ জনক করতে হলে এটাই এক্ মাত্র উপায়। যদি বেশী দামে কম সংখ্যক সিট বিক্রি হয়ে থাকে অথবা কম দামে বেশী সংখ্যক সিট বিক্রি হয়ে থাকে, এর কোন টাই এয়ারলাইন্সের জন্য সুখবর না। তাই তারা সব সবয় চেষ্টা করে একটা ব্যালান্সড পন্থায় ব্যাপারটার সমাধান করতে।

এই ব্যালান্স পাবার জন্য এয়ারলাইন্স সংস্থা গুলো কিছু অ্যানালিটিকাল স্টাডি করে থাকে। প্রথমত তারা তাদের কাস্টমারকে দুই ভাগে বিভক্ত করে ফেলে –

১। ক্যাজুয়াল বা সাধারন ট্রাভেলার

২। বিজনেস ট্রাভেলার।

সাধারন ট্রাভেলাররা ভাড়া নিয়ে অনেক সচেতন থাকে। তারা সব সময় কম ভাড়া চায়। তাই তারা ভ্রমণের বেশ আগে থেকেই টিকিট করে ফেলে। এজন্য এয়ারলাইন্স কোম্পানীগুলো তাদের কাছে কম দামে টিকিট সেল করার একটা সুযোগ পায়। টিকিট কম দামে পেতে চাইলে এটা একটা বিশেষ ট্রিক বটে। আপনি যদি মাস ২-৩ আগে ভ্রমণ পরিকল্পনা করে ফেলতে পারেন তাহলে টিকিটের দাম আপনি বেশ কমেই পেয়ে যাবেন।

আর বিজনেস ট্রাভেলারের ব্যাপারটা অবশ্যই আলাদা। তাঁরা সাধারণত একটু বেশী ফ্লেক্সিবল থাকেন এবং ভ্রমণের ৩-৫দিন আগে টিকিট করে থাকেন। আবার অনেক সময় আর্জেন্ট মিটিং বা ট্যুর এসে গেলে সেক্ষেত্রে অনেকে যাত্রা আগের দিনও টিকিট করে থাকেন। এছাড়া বিজনেস ট্রাভেলারদের টিকিট সাধারণত তাদের কোম্পানি থেকেই দেয়া হয়, তাই ভাড়া নিয়ে যাত্রীর খুব একটা চিন্তাও থাকেনা। ফলস্বরূপ তাঁরা ভ্রমণের অল্প কিছু আগেই টিকিট বুক করে থাকে। ফ্লাইট এর তারিখের যত কাছাকাছি সময়ে টিকিট বুক করা হবে, ভাড়া তত বেশী হবে। যত আগে বুক করা হবে, ভাড়া তত কম থা্কার সম্ভাবনা বেশী থাকবে। এটা একটা লিখিত নিয়ম, যা এয়ারলাইন্স সংস্থা গুলো মেনে চলে।

air fare data
এয়ার টিকেট ভাড়া বৃদ্ধির একটি সম্যক ধারণা

এতক্ষন পড়ে আপনার মনে হতেই পারে যে, তাহলে আর দেরি করে টিকেট বুক করতে যাব কেন। ট্রাভেল যেরকমই হোক, মাস তিন আগে বুক করে ফেলব আর ভাড়াও কম পাব। না প্রিয় পাঠক, ব্যাপারটা এতটা সরলও না।

এয়ারলাইন্স সংস্থা বেশ ভাল করেই জানে যে যাত্রীরা আগে ভাগেই টিকেট বুক করে ফেলতে চাইবে এবং এতে করে তাদের কম রেটে অনেক বেশী সিট সেল হয়ে যাবে, যা এয়ারলাইন্সের জন্য মোটেও লাভ জনক হবে না। তাই তারা বিশেষ এই পলিসি অবলম্বন করে থাকে।

 

এয়ারলাইন্সের পলিসি

মনে করেন, একটি এয়ার ক্রাফটে ৫০ টি ইকোনমি ক্লাস সিট রয়েছে। এখন এয়ারলাইন্স সংস্থা এই ৫০ টি সিটের সবগুলোই কম প্রাইসে অথবা বেশী প্রাইসে সেল করতে চাইবে না। কারন কম প্রাইসে সেল করলে এয়ারলাইন্সের লস, আবার বেশী প্রাইস দিলে সেক্ষেত্রে টিকিট সেলই কমে যাবে। এজন্য তারা একটা মধ্যম পন্থা অবলম্বন করে। ৫০ ইকোনমি ক্লাস সিট কে তারা সাধারণত ৩ টি ক্যাটাগরিতে ভাগ করে থাকে। এগুলোকে ‘ফেয়ার বাকেট’ বা ‘ক্লাস’ বলা হয়। ধরুন প্রথম অর্থাৎ ফেয়ার বাকেট ১ এ  এয়ারলাইন্স ৫-৭ টি সীট রাখলো। এগুলোর টিকিট প্রাইস হবে সব চাইতে কম। ভাগ্য ভাল হলে এর যেকোন একটা পেয়ে গেলে আপনি যাত্রী হিসেবে লাভবান হবেন। তবে এসব সিটের সুবিধাদিও কম থাকে, যেমন লাগেজ এলাউন্স সহ অন্যান্য সুবিধা কম পাবেন।

কোন ফেয়ার বাকেটে কয়টি সিট থাকবে তার কোন ধরা বাঁধা নিয়ম নেই। এটা একান্তই এয়ারলাইন্সের সিদ্ধান্ত।

ফেয়ার বাকেট ১ এর সেই ৫-৭ টি সিট বুক হয়ে যাবার পর  ফেয়ার বাকেটটি ক্লোজ করে দেয়া হয়। এর পর ওই কম প্রাইসে আর কেউ টিকিট বুক করতে পারবে না। বুক করতে চাইলে তাকে যেতে হবে ফেয়ার বাকেট ২ তে। সেখানে হয়ত ১৫ থেকে ২০ টা সিট থাকতে পারে। সেগুলোর ভাড়া অবশই ফেয়ার বাকেট ১ এর চাইতে বেশী হবে। যথারীতি ব্যাগ এলাউন্স সহ অন্যান্য সুবিধাও আরেকটু বেশী পাওয়া যাবে। ঠিক সেভাবেই ফেয়ার বাকেট ৩ এর টিকিট প্রাইস এবং সুযোগ সুবিধা বেশী হবে। এক্ষেত্রে আসলে সুযোগ সুবিধার খুব একটা তারতম্য হয় না সাধারণ এয়ারলাইন্স গুলোতে।

 

ব্যাতিক্রম

তবে এ নিয়মটাও একেবারে সোজা সাপ্টা না। ভাড়া বৃদ্ধির গ্রাফটা যে সোজা উপরে উঠতে থাকবে আর ভাড়া বাড়তেই থাকবে, সেটা সব সময় নাও হতে পারে। অনেক সময় অঘোষিত ভাবে হুট হাট ভাড়া কমে যেতে পারেই। এটা পুরোপুরি নির্ভর করে টিকিটের চাহিদার উপর। যেমন ফেয়ার বাকেট ১ এর টিকিট শেষ হয়ে গেলে এয়ারলাইন্স যদি দেখে যে ফেয়ার বাকেট ২ এর টিকিট চাহিদা কম, তখন তারা সেখানকার কিছু সীট ফেয়ার বাকেট ১ এর প্রাইসে সেল করা শুরু করে।

আবার যদি পিক সিজনে কোন ফ্লাইটের টিকিট দ্রুত বিক্রি হতে শুরু করে তখন এয়ারলাইন্স কোম্পানি এটাকে রেভেনিউ বাড়ানোর একটা সুযোগ হিসেবে দেখে এবং বেশিরভাগ টিকিট ফেয়ার বাকেট ১ থেকে সরিয়ে ফেয়ার বাকেট ২ বা ফেয়ার বাকেট ৩ তে নিয়ে সেল করা শুরু করবে। এমনকি তারা কিছু সিট রিজার্ভ করেও রাখে শেষ মুহূর্তে টিকিট কাটতে আসা স্পেশাল বিজনেস ট্রাভেলারদের জন্য, যারা অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে টিকিট নিতে দ্বিধা করবে না। ফলস্বরূপ এয়ারলাইন্সের রেভেনিউ বেড়ে যাবে। নীচের চার্টটি লক্ষ্য করুন। এয়ার টিকিট ভাড়া  অনেকটা এভাবেই উঠা নামা করতে থাকে।

airfare change
এয়ার টিকিট ভাড়া বৃদ্ধির/ পরিবর্তনের বিষয়টা আসলে যেভাবে কাজ করে থাকে

তাহলে বিষয়টা দাড়াল এই যে, অ্যাডভান্স বুকিং (ভ্রমনের বেশ আগেই টিকিট বুক করে ফেলা) আর ফেয়ার বাকেটের পরিবর্তন, মুলত এই দুটো ফ্যাক্টরই বিমান ভাড়া নির্ধারণে বড় ভুমিকা রাখে।

অন্যান্য ফ্যাক্টর

আরো কিছু ফ্যাক্টর আছে যেগুলো টিকেট ভাড়ার ব্যাপারে ভুমিকা রাখতে পারে। যেমন কোন কারনে ফুয়েলের দাম বেড়ে গেলে এয়ারলাইন্স কোম্পানি সেই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে অনেক সময় ভাড়া বাড়িয়ে দিবে। আবার বিশেষ সিজনে, যেমন শীত কালে অনেক মানুষ গ্রীষ্মের অনুভুতি পেতে নির্দিষ্ট কিছু গন্তব্যে বেশী ভ্রমণ করে থাকে। এই ব্যাপারগুলোতে এয়ারলাইন্স কঠিন নজর রাখে এবং টিকেট চাহিদা বাড়ার কারনে দাম বাড়িয়ে দেয়। আবার এর উল্টোটাও হতে পারে। কোন প্রতিযোগী বিমান সংস্থা যদি কোন নির্দিষ্ট রুটে নতুন ফ্লাইট চালু করে বা ডিস্কাউন্ট প্রদান করে, সেক্ষেত্রে অন্যান্য এয়ারলাইন্সও বাধ্য হয় তাদের ভাড়া কমাতে।

আশা করি এই ব্লগের মাধ্যমে আমি এয়ারলাইন্সের ভাড়ার হুট হাট বেড়ে যাবার ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করতে পেরেছি। কারো কোন প্রশ্ন থাকলে কমেন্ট সেকশনে জবাব দেবার চেস্টা করব। ধন্যবাদ।